মব সৃষ্টি করে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক এবং তার ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইনকে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানোর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) সংবাদ সম্মেলনে রামেবি ভিসি এ দাবি জানান।
রামেবির কর্মকর্তারা বলেন, বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‘আপামর ছাত্র-জনতা’ পরিচয়ে একদল ব্যক্তি প্রবেশ করে। মিছিল নিয়ে জোরপূর্বক তারা ভিসির কার্যালয়েও যায়। আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ অ্যাখ্যা দিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ ঢাকার ঠিকাদারদের দেওয়ার অভিযোগ তুলে উপাচার্য ও সেকশন অফিসারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।
এরপর আগে থেকে লিখে আনা পদত্যাগপত্রে তাদের কাছ থেকে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। স্বাক্ষর নেওয়ার পর তাদের কক্ষ থেকে বের করে দিয়ে প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার সময় উপাচার্যের কক্ষ থেকে কম্পিউটারের সিপিইউ এবং সিসিটিভি ফুটেজের যন্ত্রপাতি খুলে নিয়ে যায় ওই ব্যক্তিরা। একইসঙ্গে পুরো ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে রামেবি উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী ও সেকশন অফিসার নাজমুল হোসাইন বলেন, "সকাল ১০টা থেকে উপাচার্য মহোদয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি অনলাইন বৈঠকে যুক্ত ছিলেন। বেলা ১১টার দিকে একদল লোক মিছিল নিয়ে জোর করে কক্ষে প্রবেশ করে উপাচার্যকে গালিগালাজ করতে থাকে এবং পূর্বপ্রস্তুতকৃত পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেয়। এরপর আমাকেও ইস্তফাপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। আমি এতে অস্বীকৃতি জানালে তারা আমাকে মারধর করে।"
পরে বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন রামেবি উপাচার্য প্রফেসর ডা. জাওয়াদুল হক। তিনি বলেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ হলো শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ, ক্ষোভ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজ আমি আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে আমার কার্যালয়ে যে অভূতপূর্ব বর্বরোচিত ঘটনা ঘটেছে, তা আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি মনে করছি। আজ সম্পূর্ণ অনিয়মতান্ত্রিকভাবে কতিপয় দুষ্কৃতকারী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিপ্রিয় গোষ্ঠী ‘মব’ গঠন করে বেআইনিভাবে আমার কার্যালয়ে অনধিকার প্রবেশ করে। তারা আমাকে এবং আমার একান্ত সচিবকে (পিএস) অবরুদ্ধ করে চরম মানসিক ও শারীরিক লাঞ্ছনা চালায়। শুধু তাই নয়, আমার পিএস সহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়।
রামেবি ভিসি আরও বলেন, নিজেদের অপরাধের আলামত মুছে ফেলার জন্য হামলাকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে গেছে এবং আমার কক্ষে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যসম্বলিত কম্পিউটার এর সিপিউ ছিনতাই করে নিয়ে গেছে। এরপর সম্পূর্ণ জিম্মি অবস্থায়, প্রাণনাশের হুমকি ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে গায়ের জোরে একটি পদত্যাগপত্রে আমার স্বাক্ষর আদায় করা হয়।
প্রফেসর ডা. জাওয়াদুল হক বলেন, আমি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানাতে চাই—রাষ্ট্রীয় আইন, সংবিধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি অনুযায়ী ভয়ভীতি প্রদর্শন, শারীরিক নির্যাতন বা জিম্মি করে জোরপূর্বক নেওয়া কোনো পদত্যাগপত্রের বিন্দুমাত্র আইনি গ্রহণযোগ্যতা বা বৈধতা নেই। এটি কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদত্যাগ নয়; এটি স্পষ্টত একটি সন্ত্রাসী কায়দায় পরিচালিত প্রশাসনিক ছিনতাই।
সবশেষে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ৪ দাবি জানান রামেবি ভিসি।
দাবিগুলো হলো-
১. অবৈধ পদত্যাগ বাতিল: জিম্মি করে বলপ্রয়োগে আদায় করা তথাকথিত পদত্যাগপত্রটিকে অবিলম্বে সম্পূর্ণ অবৈধ ও নাকচ ঘোষণা করতে হবে।
২. অপহৃত মালামাল উদ্ধার: বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডডিস্ক এবং আমার কক্ষ থেকে চুরি হওয়া কম্পিউটার দ্রুত উদ্ধার করে আলামত রক্ষা করতে হবে।
৩. সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি: কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বর্বর হামলাকারী, সিসিটিভি হার্ডডিস্ক ও কম্পিউটার ছিনতাইকারী এবং জিম্মি ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা ও গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে হবে।
৪. বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা: রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজের নিরাপদ পরিবেশ এবং আইনি শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে এ ধরনের ‘মব কালচার’ ও নৈরাজ্য চলতে থাকলে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।