আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০৮:৫৩:৩৯ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৬ ০৮:৫৩:৩৯ পূর্বাহ্ন

রাকসুর অর্থব্যবহার নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, উন্নয়নকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন; হাজার কোটি টাকার নগর বাজেট ও নতুন পরিকল্পনায় বড় প্রত্যাশা

সারসংকটে কৃষক, সংঘাতে ক্যাম্পাস, প্রশ্নে প্রশাসন—তবু উন্নয়নের স্বপ্নে রাজশাহী






একদিকে আমন মৌসুমে সার পেতে কৃষকের হাহাকার, অন্যদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের সংঘাত ও রাকসুর অর্থব্যবহার নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। সরকারি দপ্তরে ঘুষের ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে, কোটি টাকার উন্নয়নকাজের মান নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। এর মধ্যেই নগর উন্নয়নে হাজার কোটি টাকার বাজেট, ক্রীড়াঙ্গনকে দেশের সেরাদের কাতারে নেওয়ার ঘোষণা এবং নাগরিক সেবার পরিধি বাড়ানোর নানা উদ্যোগ। সংকট আর সম্ভাবনার এমন দুই বিপরীত চিত্র নিয়েই গত এক সপ্তাহে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল রাজশাহী।
 
রাজশাহীর মাঠে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ আমনের সার। জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা প্রয়োজনের সময় টিএসপি ও ডিএপি সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। ডিলারের দোকানে ঘুরেও সার না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন অনেকে। পুঠিয়াতেও সার সংকট ও বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ সামনে এসেছে।
তবে প্রশাসনের হিসাব বলছে, জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিপুল পরিমাণ ইউরিয়া মজুত রয়েছে এবং কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত বা কালোবাজারির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- গুদামে সার থাকলে কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না কেন?
 
সারের পরই আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ রাকসুর অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্রদল বিক্ষোভ ও তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, রাকসুর বিভিন্ন কর্মসূচির বিপরীতে অর্থ উত্তোলন করা হলেও উল্লেখযোগ্য অর্থের বিল-ভাউচার জমা পড়েনি। অভিযোগের ভিত্তিতে হিসাব যাচাইয়ের দাবি তুলেছে তারা। রাকসু কর্তৃপক্ষ অবশ্য অভিযোগকে ভিন্নভাবে দেখছে; কাজ ও হিসাবের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর প্রয়োজনীয় নথি ও ভাউচার উপস্থাপনের কথা বলা হয়েছে। ফলে বিষয়টি এখন অভিযোগ ও জবাবের পর্যায়েই রয়েছে।
 
রাকসু ঘিরে উত্তাপ এখানেই থামেনি। ২৫ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরবর্তী রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা, শতভাগ আবাসন নিশ্চিত করতে রোডম্যাপ, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের আবাসন ভাতা, আধুনিক মেডিকেল সেন্টার ও কার্যকর সিনেট। একই সংবাদ সম্মেলনে রাকসুর জিএসের দাপ্তরিক ব্যয়ের হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
অর্থাৎ রাকসুকে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু টাকা-পয়সার হিসাবেই সীমাবদ্ধ নেই; শিক্ষার্থীদের আবাসন, চিকিৎসা, সিনেট ও ভবিষ্যৎ নির্বাচন—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র প্রতিনিধিত্বের কার্যকারিতাও আলোচনায় এসেছে।
 
এর বাইরে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সামান্য একটি বিরোধ থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়া, আহত হওয়ার ঘটনা এবং প্রশাসনের তদন্ত কমিটি গঠন—সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও সহনশীলতার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
 
রাজশাহীর উন্নয়ন প্রকল্পের চিত্রও পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। বিভাগীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর কাজ বন্ধ করা হয়েছে। প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্পে এমন অভিযোগ ওঠায় সরকারি অর্থে উন্নয়নকাজের মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
 
তবে এই প্রশ্নের বিপরীত দিকেও রয়েছে বড় প্রত্যাশা। ভূমিমন্ত্রী মো. মিজানুর রহমান মিনু রাজশাহীর ক্রীড়াঙ্গনের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে এনে জেলাকে দেশের সেরা ক্রীড়া অঞ্চলে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে তৃণমূল থেকে খেলোয়াড় তৈরির পাশাপাশি ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের কথাও এসেছে।
ভূমিমন্ত্রী একই সময়ে ভূমিদস্যু ও মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছেন। রাজশাহী থেকে এসব কর্মকাণ্ড নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
 
নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থের পরিকল্পনা রয়েছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার প্রায় ১ হাজার ৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। নাগরিকদের ওপর নতুন কর আরোপ বা বিদ্যমান কর বাড়ানো ছাড়াই এই বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। বাজেট ঘোষণা করেছেন রাসিক প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন।
 
বাজেটের অঙ্ক বড় হলেও নগরবাসীর প্রত্যাশাও কম নয়। সড়ক, যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক সেবায় এই অর্থের কতটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে পারে—সেটিই হবে প্রশাসক রিটনের জন্য বড় পরীক্ষা।
 
রাজশাহীর ঐতিহ্য ও বিনোদন অবকাঠামো নিয়েও উদ্যোগের কথা এসেছে। কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানাকে আধুনিকায়ন এবং নতুন পশুপাখি সংযোজনের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের অবহেলায় থাকা বিনোদনকেন্দ্রটিকে নতুন রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
 
অন্যদিকে সরকারি সেবায় অনিয়মের অভিযোগও রাজশাহীর আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। তানোর উপজেলা ভূমি অফিসের এক কর্মচারীর ঘুষ নেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি একদিকে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, অন্যদিকে ভূমিসেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগও সামনে এনেছে।
 
সব মিলিয়ে গত এক সপ্তাহের রাজশাহী যেন উন্নয়ন ও জবাবদিহির একসঙ্গে চলা এক পরীক্ষাক্ষেত্র। একদিকে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানোর প্রশ্ন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন, সরকারি প্রকল্পের মান এবং নাগরিক সেবার বাস্তবতা; অন্যদিকে হাজার কোটি টাকার বাজেট, ক্রীড়াঙ্গন উন্নয়ন ও নগর আধুনিকায়নের পরিকল্পনা।
 
রাজশাহীর সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উন্নয়নের অঙ্ক কত—তা নয়; বরং সেই উন্নয়নের কতটা মানুষের জীবনে পৌঁছাবে।
কারণ কৃষক যদি সার পেতে দোকানে দোকানে ঘোরেন, শিক্ষার্থী যদি আবাসনের অপেক্ষায় থাকেন, নাগরিক যদি সরকারি সেবা নিতে হয়রানির শিকার হন কিংবা কোটি টাকার প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে তাহলে কাগজের বাজেট আর বাস্তব উন্নয়নের মধ্যে দূরত্ব থেকেই যায়।
 
রাজশাহীর গত এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ তাই একটি কথাই বলছে, উন্নয়নের ঘোষণা আছে, পরিকল্পনাও আছে; এখন দরকার তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।

 
সম্পাদক : বীর মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক তৈয়বুর রহমান, নির্বাহী সম্পাদক : আরিফ হোসেন, বার্তা সম্পাদক : মোশারফ হোসেন, উপদেষ্টা : ফাতেমা বেগম
ই-মেইল: 24sonalirajshahi@gmail.com, ওয়েবসাইট : www.sonalirajshahi.com, বার্তা বাহক নম্বর: 01715801785, 01766227626, 01784336244, 01712414708